এক বৈশাখের সকাল। ভোটের রেজাল্ট, মমতা বন্দোপাধ্যায় হেরে গেছেন। চারিদিকে গেরুয়া আবীর। 'সোনার বাংলার' শুরু। মোড়ে মোড়ে জয় শ্রীরাম, পাড়ায় পাড়ায় মন্দির। ধুপের গন্ধে বাংলা যেন এক 'স্নিগ্ধনগর'।
পরের দিন মহামানব যুগপুরুষ শ্রী শ্রী অমিত শা জির মুখনিঃসৃত বাণী অনুসারে বাংলায় বন্ধ হয়ে গেলো স্বাস্থ্যসাথী। চালু হলো আয়ুষ্মান। সেই দিনই রাতে শ্রী রামমোদির চরম ভক্ত 'বিকাশ'দার বাবা কলতলায় পড়ে গিয়ে হেড অব দ্য ফিমার ভেঙে বসলেন। বিকাশদা আগের বার মায়ের কিডনি স্টোন অপারেশন স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড দিয়ে ফ্রিতে করেছিলেন। এই বার বিকাশদা বুক ফুলিয়ে আয়ুষ্মান কার্ড নিয়ে দৌড়লেন প্রাইভেট হাসপাতালে, বিকাশদা ন্যানো গাড়ি চালাতেন, কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী চারচাকা থাকলে আয়ুষ্মান পাবে না কেউ,টাটার ন্যানো থাকলেও পাবে না। বিকাশ দাও পেলেননা।। কড় কড়ে ১ লাখ ১০ হাজার দিয়ে বাবার অপারেশন করিয়ে বাড়ি ফিরলেন যখন, তখন আর গাল পাড়ার জন্য রাজ্যে মমতা নেই। সেই মমতা যিনি থাকলে আজ তার বাবার চিকিৎসা ফ্রিতেই হতো,চারচাকা গাড়ি থাকলেও।তিনি বিজেপি করলেও।
তারপরের দিন দুপুরে বিকাশদা শুনলেন কন্যাশ্রী বন্ধ। রাজ্যে চালু হয়েছে বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও প্রকল্প। বিকাশদার দাদার একটাই মেয়ে, তন্বী আধুনিকা।কন্যাশ্রীর প্রাপ্য বুঝে নিয়ে, সদ্য ভোটাধিকার পেয়েই মমতাকে ঘেন্না করে সেও যুগপুরুষ মোদিজির আদর্শেই ছাপ মেরেছিলো। জিতে যাবার খুশীতে সে একটি শর্ট স্কার্ট আর টপ পরে তার প্রাণনাথের সাথে পার্কের পথে পা বাড়াল। রাস্তায় কয়েকজন কপালে তিলক ষন্ডা পথ আটকে হুমকি দিলো এই সব অশ্লীল পোষাক পরে রাস্তায় বেরোনো যাবে না,অন্যথায় ধর্ষিতা হতে হবে। ভীত মেয়েটি বাড়ি এসে কান্নাকাটি করে বিছানা ভিজিয়ে ফেললেও আর মমতাকে দোষ দিতে পারলো না। যে মমতা মেয়েদের জন্য লেডিস স্পেশাল ট্রেন থেকে, মাতৃত্বকালীন ছুটি থেকে কন্যাশ্রী থেকে মেয়েদের অধিকার বুঝে নেবার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন।
বিকাশদার এক আত্নীয় এদিকে আবার সিভিক পুলিশ। রাতদিন মমতাকে আড়ালে খিল্লি করে পাওয়ার এক্সেসের মধ্যে থেকেও হঠাত পরের দিন শুনলো সিভিক অবৈধ। সদ্য বিয়ে করা তার মাথায় হাত। মমতাকে গালি দেবার জায়গাও তার আর নেই।। যে মমতার ছোঁয়ায় কয়েক লাখ যুবক অন্তত অন্নসংস্থান করতে পেরেছিলো তাদের মুখ আর তার মুখ যেন একাকার। তবু আর শোধরানোর জায়গা নেই।
বিকাশদার নিজের মেয়ে প্রাইমারীর জন্য খাটছে। শেষ দশ বছরে রেকর্ড ৭০ হাজার প্রাইমারি শিক্ষক নেবার পরেও সে ভাবে "রাজ্যে প্রাথমিকে নিয়োগ নেই। এই বার বছরে ৫০ হাজার নিয়োগ উফফ সীতা মাইয়া কি জয়"। কিন্ত দুদিন পরেই রাজ্যের অধিকাংশ সরকার পরিচালিত স্কুল প্রাইভেটের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। নিয়োগ স্থগিত।
গালি দেওয়ার সুযোগ নেই। কারন এই মামনিই ফেস বুকে পোস্টিয়েছিলো 'বেসরকারী হলে পরিষেবা ভালো হবে'।
এদিকে বিকাশ দা বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। মুসলমানদের উপর সেই রাগ। জাতে নমঃশূদ্র মানে মতুয়া। চায়ের দোকান থেকে মাছের বাজার চিল্লিয়ে বলে বেড়িয়েছিলেন এনআরসি চাই। তার যদিও ভোটার কার্ড,রেশন কার্ড, আধার কার্ড এমনকি পাসপোর্টও আছে। যুগপুরুষ অমিত শা জির যে যে কার্ড আছে তারও সেই সেই কার্ডই আছে তাও তিনি এনআরসি করে চিল্লিয়েছেন। মোল্লা টাইট হবে এই সুখে তিনি সুখনিদ্রা দিয়েছেন। কিন্তু তিনদিন পরেই এনআরসির নোটিস। বিকাশদার বার্থ সার্টিফিকেট নেই।তার মেয়েরও নেই শুধু এডমিট আছে।। সব কাগজ নিয়ে ভোর তিনটেতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে লাইনে দাঁড়ালেন। কোনো মোল্লাকে দেখতে পেলেন না। লাইনের আগে পিছে সব 'যুগপুরুষ অমিত শা জির ভক্তদের লাইন আর কয়েক জন 'তিনোমোল্লা হিন্দু' দাঁড়িয়ে। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও 'মোল্লা' পেলেন না। বুক দুরু দুরু, আসামের সেই ক্যাম্পে বন্দি হিন্দুগুলোর কথা মনে পড়ছে। যাকে সত্যি জেনেও ফেবুতে ফেক বলে দাগাতেন, আজ তা তার সামনে।
একজনকে লাইনটা রাখতে বলে পরিচিত নেতার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন "অমুকদা আমি বিকাশ, একনিষ্ঠ ভক্ত প্লাস খাঁটি হিন্দুও বটে আমি কেন লাইনে?"
উত্তর এলো "ভক্ত আর ভক্তি যেখানে মেলে সেখানেই তো বিকাশ ঘটেরে, শুনুন কাল পার্টি অফিসে হাজার পঞ্চাশ নিয়ে আসুন দেখি কি করা যায়। এটা তো আর কাটমানি ফাটফানি নয়,এটা আপনার ভিটেমাটির ব্যাপার, আপনি ভাবুন। জয় শ্রীরাম"
বিকাশদা ধীর পায়ে লাইনের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন।দরদর করে ঘামছেন, আর বার বার করে মনে পড়ছে যাকে নোংরা ভাবে 'বেগম' বলতেন তার উক্তি- "আমি থাকতে বাংলায় এনআরসি করতে দেবই না", আজ যিনি ক্ষমতায় নেই।। বিকাশদা বুঝতে পারছে প্রায়শ্চিত্তর জায়গাই নেই আর। বনগঁা লোকালের ভীষণ ভিড়ে যে মেয়েকে আগে তুলতে তার বুক কাঁপত, মমতার লেডিস স্পেশাল চড়ে অযাচিত স্পর্শ এড়ানো সেই কন্যার বাবা বিকাশদা লাইনে দাঁড়িয়ে এখনো।।।। সামনে এনাউন্সমেন্ট ------
নেক্সট।

গল্প হলেও সত্যি
ReplyDeletePeople that day realise what's BJP.
ReplyDelete