
দেশের একজন সাধারণ নাগরিক একাই একটা সরকারের সমস্ত প্রচেষ্টা বানচাল করে দিতে পারে সেটা শুভঙ্কর বাবুই করে দেখিয়ে দিলেন। যে আইন দিয়ে মোদী সরকার দেশের মানুষকে বিপদে ফেলতে চেয়েছিল - সেই আইন দিয়েই উনি সরকারকে বিপদে ফেলে দিলেন। উনি প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকে RTI করে বললেন - আমাদের কাগজ দেখার আগে আপনারা আপনাদের নিজেদের কাগজ দেখান। এখানেই ফেঁসে গেল কালি রামের ঢোল।
২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর সংসদে পাশ হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। ১২ ডিসেম্বর সেই বিলে সই করেন রাষ্ট্রপতি। দিল্লির জি ডি বিড়লা মার্গের শাহীন বাগে শুরু হয় প্রতিবাদ আন্দোলন। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই আন্দোলনে জড়িত থাকার জন্য বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। সার্জিল ইমাম, ভারভাড়া রাও, ডাক্তার কফিল খান সহ আরো অনেক মানুষকে জেলে ঢুকিয়েও আন্দোলন দমন করা যায়নি। পুলিশ দিয়ে কাজ হচ্ছে না দেখে লেলিয়ে দেয়া হয় খুনে বাহিনী। তাতেও আন্দোলনে ভাটা পড়েনি।
শুভঙ্কর বাবু জানতেন এসব আন্দোলনে সরকার কোন পাত্তা দেবে না। আন্দোলনকারীদের কাছে সরকার মাথা নত করবে না। বরং দুমড়ে মুচড়ে এই আন্দোলনকে শেষ করে দেবে। কারন সরকারের হাতে এখনো ৪ বছর সময় আছে। ফলে অন্য্ রাস্তা খুঁজতে থাকেন উনি। হঠাৎ খেয়াল হয় এই সংশোধনী আইনের মধ্যেই বিরাট ফাঁক থেকে গেছে। এবার সেই ফাঁক দিয়েই শুরু হয় তার একক লড়াই। উনি বুঝতে পারেন অন্যদের ফাঁদে ফেলতে এসে নিজেই ফাঁদে ঢুকে গেছে সরকার। এবার শুধু সেই ফাঁদের রশিটা টেনে ধরতে হবে।
উনার RTI এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিলেন উনার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র স্বরূপ কোন কাগজ নেই। উনি জন্মসূত্রেই ভারতীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন উনার কাগজ দেশের সুরক্ষার সাথে জড়িত তাই দেখানো যাবে না। এবং রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জানানো হলো এটা উনার ব্যক্তিগত কাগজ তাই দেখানো যাবে না।
শুভঙ্কর বাবু RTI এর উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রীকে লিখলেন - যদি জন্মসূত্রে ভারতীয় হয়ে থাকেন তাহলে জন্মের সার্টিফিকেট দেখিয়ে প্রমান করুন যে উনি জন্মসূত্রে ভারতীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে লিখলেন যে দেখানো হোক কিভাবে উনার জন্মের সার্টিফিকেট দেশের সুরক্ষা করছে। এবং রাষ্ট্রপতিকে লিখলেন - আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র যদি ব্যক্তিগত বিষয় হয় তাহলে আমারটা নয় কেন? আপনি যদি না দেখান তাহলে আমি কেন দেখাবো? আইনে আপনি সই করেছেন তাই সর্বপ্রথম আপনার দেখানো কর্তব্য।
এর পর তালগোল পাকিয়ে যায় সরকারের অভ্যন্তরে। সমস্ত RTI এর জবাব দেয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। NRC প্রক্রিয়া সাময়িক স্থগিত রাখার ঘোষণা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। জটিলতা তৈরি হয় সেনসাস বা ১০ বছর পর পর হওয়া জনগণনা নিয়েও। এর মধ্যেই চলে আসে করোনা ভাইরাস। অনেকেই ভাবছেন হয়তো করোনার জন্য সরকার NRC স্থগিত রেখেছে। কিন্তু বাস্তবে আসামের NRC প্রক্রিয়াতে সামান্যতম ঢিলা দেয়নি সরকার। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া গোটা দেশে চালু করতে গিয়ে সেই জালে নিজেই জড়িয়ে গেছে সরকার। এখন সেই সংশোধনী সংশোধন অথবা বাতিল করা ছাড়া সরকারের কাছে অন্য কোন পথ খোলা নেই।
এটাই ছিল দেশে জাতপাত নিয়ে বিজেপির আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গেম প্ল্যান। দীর্ঘ দিন ধরে সাজানো এই গেমে বিজেপির পলিটিক্যাল প্রফিট ছিল প্রচুর। কিন্তু নিজেদের খেলায় নিজেদেরকেই এভাবে হারতে হবে এটা স্বপ্নেও ভাবেনি বিজেপি। উনারা ভেবেছিলেন রাম মন্দির চ্যাপ্টার ক্লোজ করে NRC চ্যাপ্টার শুরু করবেন। কিন্তু অনেক যত্নে সাজানো বিজেপির সে গুড়ে বালি ঢেলে দিলেন শুভঙ্কর বাবু। একজন সাধারণ ছাপোষা পাবলিক যে এভাবে বিজেপির এত বড় গেমের বারোটা বাজিয়ে দেবে এটা স্বপ্নেও মাথায় আসেনি কারো।
শুভঙ্কর বাবু জানেন বিজেপি এতদিনের পরিকল্পনা এভাবে মাটি হয়ে যেতে দেবে না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের খেলা খেলতে কিছু না কিছু করবেই। কিন্তু উনিও বিজেপির প্রতিটি সাম্প্রদায়িক বলে ছক্কা হাঁকাবেন - এতোটাই উনার আত্মবিশ্বাস। উনিও অপেক্ষা করছেন পরবর্তী বল ডেলিভারির জন্য। শুভঙ্কর বাবুকে হাজার হাজার ধন্যবাদ জানাই। খাঁচার বাঘ আর জঙ্গলের বাঘের মধ্যে এটাই পার্থক্য।
ম্যাসেজটি ভারতবর্ষের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন প্লিজ।
Thanks
ReplyDelete