গত শতকের ৭০ দশক থেকে ২০১১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলেছিল সন্ত্রাসের বাতাবরন। শাসনকালের ৩৪ বছর ও তার আগে সিপিআইএম তাদের বিরোধীদের নৃশংস ভাবে খুন করেছিল। প্রায় ৫৫০০০ বিরোধী খুন হয়েছে তাদের হাতে।
আসুন ফিরে দেখি সেই রক্তাক্ত ইতিহাসের কিছু অংশ:
সাঁইবাড়ি গণহত্যা, ১৯৭০
বর্ধমানে কংগ্রেসের দূর্গ টিকিয়ে রেখেছিলেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাঁই পরিবার। ১৭ই মার্চ পরিকল্পিত ভাবে দেড় হাজার সিপিএম সমর্থক চারদিক থেকে ছুটে এসে তীর ধনুক, টাঙ্গি,বল্লম ইত্যাদি নিয়ে সাঁই বাড়ি ঘিরে ফেলে। নারকীয় ভাবে খুন করা হয় প্রণব সাঁই ও মলয় সাঁইকে তার ওপর উপুর করে ফেলা হয়। ছেলেদের রক্তমাখা ভাত মৃগনয়না দেবীর মুখে গুঁজে দেয় সিপিএমের বীরপুঙ্গবরা। তদন্ত কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিয়ে ফেরার পথে সাঁইবাড়ি হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী গুলমনী রায়কে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করা হয়। ঠিক গুলমনী রায়ের মতই সাঁইবাড়ির এক ছেলে নবকুমার সাঁইকে রায়নার আহ্লাদিপুরে টাঙ্গি দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়।
মরিচঝাঁপি গণহত্যা
সুন্দরবনের মরিচঝাঁপিতে পূর্ববঙ্গের বহু রিফিউজি আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার তাদের উৎখাত করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। ১৯৭৯ সালের ২৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় অর্থনৈতিক অবরোধ। ৩০টি লঞ্চ অধিগ্রহণ করে মরিচঝাঁপিকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। ৩১ জানুয়ারি ৩৬ জন মরিয়া যুবক পাশের দ্বীপ কুমীরমারি থেকে খাবার গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা যায়। ১৩ মে মরিচঝাঁপিতে নরক ভেঙ্গে পড়ে। গভীর রাত থেকে সেখানে শুরু হয় বর্বর এক নৃশংসতা। টানা তিনদিন চলে আক্রমণ।
২১শে জুলাই গণহত্যা
১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ডাক দিয়েছিলেন মহাকরণ অভিযানের। দাবি ছিল ভোটার কার্ড ছাড়া নির্বাচন নয়। যুব কংগ্রেস কর্মীরা কলকাতার পাঁচটি অঞ্চলে জমায়েত হন। তাঁরা সকলে ব্রেবোর্ণ রোড ধরে এগোতে শুরু করেন মহাকরণের উদ্দেশ্যে। এক বিশাল পুলিশ বাহিনী তাঁদের পথরোধ করে টি বোর্ডের অফিসের কাছে। এই শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর পুলিশের তরফে শুরু হয় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও রেয়াৎ করেনি পুলিশ। কার্জন পার্কের কাছে দৌঁড়াতে শুরু করেন যুব কর্মীরা। এবার পুলিশ গুলি চালানো শুরু করে; মুহূর্তের মধ্যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কর্মীরা। প্রাণ হারান ১৩ জন সমর্থক ও আহত হন শতাধিক কর্মী।
নানুর গণহত্যা
২০০০ সালের ২৭ জুলাই নানুর ব্লকের সুচপুর গ্রামে ১১ জন তৃণমুল সমর্থক কৃষককে কুপিয়ে খুন করে হার্মাদরা। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শীদেরও রেয়াত করা হয়নি।
ছোট আঙ্গারিয়া গণহত্যা
২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি মেদিনীপুর জেলার ছোট আঙ্গারিয়া গ্রামে একটি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে ১১ জন তৃণমূলকর্মীকে নৃশংসভাবে খুন করে সিপিএম।
রক্তাক্ত সিঙ্গুর
২০০৬ সালের মে মাসে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার টাটা গোষ্ঠীর ১ লাখি গাড়ির কারখানা ও আনুসাঙ্গিক শিল্প গড়ার জন্য সিঙ্গুরের মোট ১০০০ একর জমি গায়ের জোরে অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কৃষক বিক্ষোভ। প্রায় ৩০০০ কৃষক সিঙ্গুরের বিডিও অফিসের সামনে ধর্না দেয় সরকারের এই জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতায়।
২৫শে সেপ্টেম্বর বলপূর্বক তৎকালীন সরকার জমি অধিগ্রহণ করে। ৪০০রও বেশী মহিলা, পুরুষ, শিশু নির্মম ভাবে অত্যাচারিত হন। ৭৮ জন প্রতিবাদী – যার মধ্যে ২৭ জন মহিলা ছিলেন – গ্রেফতার হন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাত ১:৪০ নাগাদ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদরত মানুষের ওপর নেমে আসে RAF ও পুলিশের নির্মম অত্যাচার। পুলিশের অত্যাচারে আহত রাজকুমার ভুল ২৮ তারিখ মারা যান।
৩০শে নভেম্বর সিঙ্গুর যাওয়ার পথে আটকে দেওয়া হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ৪ঠা ডিসেম্বর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মতলায় অনশন শুরু করেন। ২৬ দিন চলে এই অনশন। ১৮ই ডিসেম্বর ‘সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা সমিতির’ অন্যতম প্রতিবাদী তাপসী মালিককে ধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারা হয়।
নন্দীগ্রাম গণহত্যা
সিঙ্গুরের মতই নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলন শুরু হয় একটি কেমিক্যাল হাব গড়ার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে।
২০০৭ সালের ১৪ই মার্চ পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামের ১ নম্বর ব্লকে নিরপরাধ গ্রামবাসীদের প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছিল সশস্ত্র পুলিশ ও একদল বন্দুকবাহিনী। এছাড়াও আহত হয়েছিল হাজারের উপর নিস্পাপ গ্রামবাসী যাদের মধ্যে অনেকই মহিলা এবং শিশুও ছিল। মিডিয়া ও বাইরে থেকে যাতে কেউ ঢুকতে না পারে, তাই তারা নন্দীগ্রামের ঢোকার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল।
দোল উৎসবে শ্রী গৌরাঙ্গের নামকীর্তন করতে করতে একদিকে যেমন হিন্দুরা গ্রামের তিন দিকে জড়ো হচ্ছিলো, অন্য দিকে মুসলমান সম্প্রদায় মানুষরাও পবিত্র কোরান পাঠের জন্য জমায়েত হচ্ছিলো। এইভাবেই গ্রামের সমস্ত মানুষজন এক অহিংস শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে এই ঘটনার প্রতিবাদ করছিল।বিভিন্ন সূত্রের খবর এই হাজারো গ্রামবাসীর জমায়েত কে লক্ষ করেই হঠাৎই শুরু হয়েছিল কাঁদানে গ্যাস ও গুলির বৃষ্টি।
নেতাই গণহত্যা
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক দু’মাস আগেই ৭ই জানুয়ারী অবিভক্ত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার লালগড়ের নেতাই গ্রামে রথীন দণ্ডপাটের বাড়িতে থাকা সিপিএমের সশস্ত্র ক্যাম্প থেকে গ্রামবাসীদের উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয়। ঘটনায় ৪ মহিলা সহ মোট ৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন প্রায় ২২ জন।
২০১১-য় পরিবর্তনের পর সেই রক্তাক্ত যুগের অবসান হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্যের ফিরেছে শান্তি। ‘বদলা নয় বদল চাই’ স্লোগানটিকে বাস্তবায়িত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

Comments
Post a Comment