একদিকে প্রশাসনিক কর্তাদের চাপে রেখে উন্নয়নে জোয়ার আনা অন্যদিকে দলীয় জনপ্রতিনিধিদের কোন্দলে রাশ টানা। পঞ্চায়েত ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকের সারাংশ এটাই। হুগলি, বর্ধমান, বীরভূমের পর লক্ষ্মীবারে মেদিনীপুর পুলিশ লাইনে মুখ্যমন্ত্রীর সভা থেকে উঠে এল এমনই সারবত্তা।
ডেবরার বিধায়ক সেলিমা খাতুনকে দাঁড় করিয়ে কড়া মেজাজে বললেন, ''নিজেদের মধ্যে লড়াই করবে না, এটা আমি চাই না।'' ঘাটালের সাংসদ অভিনেতা দেবের ডেবরা ব্লক প্রতিনিধি অলক আচার্য, স্থানীয় নেতা বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়দের নামোল্লেখ করে সেলিমার উদ্দেশ্যে দিদিমণির হুঁশিয়ারি, ''ওরা কিন্তু তোমার থেকে অনেক সিনিয়র। ওদের সঙ্গে আলোচনা করে একসঙ্গে কাজ করো।''
গত বিধানসভা ভোটে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক, রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সূর্যকান্ত মিশ্রর নির্বাচনী কেন্দ্র নারায়ণগড়ে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশ্যে মমতার কাতর আর্জি ছিল, ''আপনারা ওই লোকটাকে (সূর্যকান্ত) হারিয়ে প্রদ্যোত্কে জিতিয়ে দিন। কথা দিচ্ছি, যা চাইবেন তাই দেব।'' এদিন আমলা-জনপ্রতিনিধিতে ঠাসা মেদিনীপুর পুলিশ লাইনের সেই সভায় নারায়ণগড়ের দলীয় বিধায়ক প্রদ্যোত্ ঘোষের উদ্দেশ্যে রণংদেহী মূর্তি ধারণ করতে দেখা যায় রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানকে। সরাসরি কৈফিয়তের সুরে জানতে চান, ''তুমি অন্যদের সহযোগিতা করো?'' এরপরই মমতার সাফ কথা, ''বিধায়ক বলে কেউ আলাদা নয়। সবাই সমান। কেউ বড় নয়। সূর্য অট্ট, কওসর, মিহিরদা-দের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করো।''
এদিন দিদিমণির কোপে পড়তে দেখা যায় শালবনীর বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাতোকেও। মাইক্রোফোন হাতে মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ''শ্রীকান্ত কোথায়?'' বিধায়ক উঠে দাঁড়াতেই স্কুলের দিদিমণির ঢঙে মমতা-বাণী, ''তুমি কিন্তু শালবনি, গোয়ালতোড়ে সময় দিচ্ছ না!'' বিধায়ক পাল্টা কিছু বলতে গেলে এবার মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তা, ''আমি না জেনে কোনও কথা বলি না। তুমি ফাঁকি দিচ্ছো বলেই তো বলছি!''
অন্যান্য জেলার মতো পশ্চিম মেদিনীপুরেও তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল সুবিদিত। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রশাসনিক বৈঠকের আড়ালে পঞ্চায়েত ভোটের মুখে এভাবেই ব্লকে ব্লকে কোন্দল নিরসনের মরিয়া প্রচেষ্টা শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রার্থীপদ নিয়ে এখন থেকেই দলের অন্দরে যে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে, তা অজানা নয় মুখ্যমন্ত্রীর। সংরক্ষণের গেরোয় ভাল কাজ করেও এবারে হয়তো অনেকে প্রার্থী হতে পারবেন না।
সেকথা মাথায় রেখেই প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রীকে বলতে শোনা যায়, ''সংরক্ষণ তো সংসদের আইন। সংরক্ষণের গেরোয় অনেকে হয়তো প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু 'আমার সিট চলে গেল'- এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। যাঁরা ভাল কাজ করবেন, সরকার তাঁদের পাশে থাকবে।'' মনে করিয়ে দেন, ''সবাই ভাল কাজ করে এমন নয়। তবে যাঁরা ভাল কাজ করছে, তাঁরা যদি কোনও কারণে টিকিট নাও পান, সরকার তাঁদের অন্য কোনও ভাবে কাজে লাগাবে।''

Comments
Post a Comment