FAM4TMC
সপ্তাহ খানেক আগে জানাজানি হয়েছে গুটিকয়েক গ্রাহককে সুবিধা করে দিতে ১১, ৪০০ কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) থেকে। আর এই জালিয়াতির ঘটনায় মধ্যমণি হলেন বিলিয়নিয়ার অলংকার ব্যবসায়ী নীবর মোদী, তার মামা মেহুল চোক্সি ও তাদের সংস্থা। এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘিরে দেশ জুড়ে হইচই শুরু হতেই আবার শিল্পমহল থেকে আওয়াজ উঠেছে ব্যাংক বেসরকারিকরণের জন্য।
বণিকসভা ব্যাংক বেসরকারিকরণের মাধ্যমে সমাধান সূত্র খুঁজতে চাওয়ায় একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন এসে যাচ্ছে । তবে কি তাঁরা এদেশের ইতিহাসটা ভুলে গিয়েছে নাকি?
আজকের প্রজন্ম সেভাবে পরিচিত নয় 'ব্যাংক ফেল' কথাটার সঙ্গে । কিন্তু স্বাধীনতার আগে বলে নয় তার পরেও বেশ কয়েক বছর এদেশে মাঝে মধ্যেই ব্যাংকে তালা পড়তে দেখা যেত । সেজন্য একদিকে যেমন কাজ হারাতেন সেই ব্যাংকের কর্মীরা আবার অন্যদিকে সেখানে সঞ্চিত টাকা রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসতেন গ্রাহক এবং আমানতকারীরা। তখনকার বহু গল্প উপন্যাস কিংবা সিনেমায় এই ব্যাংক উঠে যাওয়া ঘটনা উঠে আসত।
শ্রমিক সংগঠনগুলি সম্পর্কে একটা অভিযোগ প্রায়শই ওঠে- ইউনিয়ন শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করছে অথচ তাদের দায়িত্ববোধের দিকটা শেখায়নি। । কারণ শ্রমিকদের উসকে দেওয়া হয়েছে তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনের দিকে অথচ সংস্থাকে বাঁচাতে কর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া যে উচিত নয়, সে শিক্ষা ইউনিয়ন কখনও দেয়নি। । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প মহলের আচরণ দেখে উল্টো কথা বলতে হচ্ছে - বণিকসভাগুলি শিল্পপতিদের অধিকার সচেতন করলেও কেন দায়িত্ব সচেতন করছে না।
বিভিন্ন সময় বণিকসভাগুলি তাদের প্রভাবশালীর ক্ষমতা নিয়ে 'লবিবাজি' করে চলেছে - কখনও সেটা সুদের হার কমানোর জন্য কখনও বা কর কমানো অথবা অন্য কোনও সুযোগ সুবিধার দাবিতে। অথচ শিল্প মহলের দায়িত্ববোধ জাগাতে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে ? নইলে এভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে অদেয় ঋণের পাহাড় জমবে কেন? ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন শিল্পপতিরা? নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে বেআইনি পথে ঋণ মঞ্জুর অথবা ব্যাংক থেকে অঙ্গীকারপত্র (লেটার অফ গ্যারান্টি) 'ম্যানেজ' করছেন কেন ব্যবসায়ীরা? সমাজে থেকে ব্যবসা করার সময় ঠিক মতো ঋণ পরিশোধ করা যে তাদের দায়িত্ব সেটা কেন মনে রাখা হচ্ছে না? এরা যাতে সুনাগরিকের মতো দায়িত্ব সচেতনভাবে ব্যবসা করে তার জন্য বণিকসভাগুলি কতটা প্রকৃত অর্থে চেষ্টা করেছে ।
দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ৭০শতাংশ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দখলে। নীরব মোদীর এই জালিয়াতি নজরে আসার পরে বণিকসভা ফিকি, অ্যাসোচেম সুপারিশ করেছে সরকারের হাতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ার বেচে ব্যাংক বেসরকারিকরণ জরুরি । যুক্তি দেখান হয়েছে, সরকার গত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বাস্থ্য ফেরাতে চেষ্টা করলেও তা করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে গোটা দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় পুঞ্জীভূত অনুত্পাদক সম্পদের পরিমাণ ৮ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে । তারমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রয়েছে অদেয় ঋণ সাত লক্ষ কোটি টাকা।এরই রেশ টেনে বণিকসভার বক্তব্য এভাবে শুধুমাত্র মূলধন যুগিয়ে কোনও স্থায়ী সমাধান হবে না । বরং ব্যাংক বেসরকারিকরণ হলে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেওয়ার প্রবণতা কমবে, থাকবে নজরদারি এবং বাড়বে দক্ষতা।
ষাটের দশকের শেষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে জাতীয়করণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি ব্যাংককেও জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ফলে সেভাবে আর এখন ব্যাংক উঠে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না । তাছাড়া তেমন ঘটনা ঘটার আঁচ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংককে পরিত্রাতার ভূমিকা নিয়ে নড়ে চড়ে উঠতে দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ত্রুটিমুক্ত একথা বলা যায় না ঠিকই। কারণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার দরুন ব্যাংকের কার্যকলাপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় ঠিকই। তবু রাষ্ট্রায়ত্ত থাকলে সরকারের একটা দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু ব্যাংককে বেসরকারিকরণের পরে সেই দায়টা সরকার সহজেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
এছাড়া সরকারি সংস্থা মানে অপদার্থ এবং বেসরকারি মানেই তা দক্ষ এমন ভাবনাটাও তো ঠিক নয়। কারণ মনে রাখা উচিত বহু ক্ষেত্রে লোকসানে চলা বেসরকারি সংস্থাকে বাঁচাতেই সাধারণত সরকার তা অধিগ্রহণ করত। বেশি দিন যেতে হবে না কয়েক বছর আগে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। গত শতাব্দীর ৯০ দশকে জন্ম হওয়া বেসরকারি গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাংক যখন লাটে উঠল তখন সেই ব্যাংকে বাঁচাতে অধিগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অফ কমার্স। ফলে বেসরকারি ব্যাংকের দায়ভার একটি
সরকারি ব্যাংকেরই ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আর একটা কথা মনে করিয়ে দিই, ২০০৭-'০৮ সালে মার্কিন মুলুকে এআইজি এবং লেম্যান ব্রাদার্সের পতনের জেরে শুধু সে দেশ নয় গোটা দুনিয়ার অর্থ ব্যবস্থা কেঁপে উঠেছিল। বহু ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থায় লালবাতি জ্বলেছিল। যার জেরে আর্থিক ভাবে ডুবেছিলেন শুধুমাত্র ফাটকাবাজরা নন সাধারণ মানুষও । তবে এটা ঠিক সেই সঙ্কট কালে ভারতের অর্থনীতি তেমন কোনও আঘাত পায়নি কারণ দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাটার মালিকানা মোটের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন। অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মতো এখানকার ব্যাংকগুলি বিদেশি অথবা বেসরকারি মালিকানায় থাকত তাহলে কতটা বিপদে পড়তে হত আশা করি বণিকসভার কর্তারা আজও সেটা অনুভব করতে পারেন।
আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কথা যদি বলা হয় তাহলে দেখা যায় স্বনির্ভর গোষ্ঠী যা ঋণ নেয় তার অধিকাংশই ক্ষেত্রেই সুদ সহ ফেরত পায় ব্যাংক । অর্থাত্ গরিব অথবা সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষেরা মিলেমিশে ঋণ নিলে সেই টাকা ব্যাংকের মার যায় না বরং সময় মতো তা ফেরত হয়। অন্যদিকে গত বছরে রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রে জানা গিয়েছিল অনাদায়ী ঋণের ২৫ শতাংশ ছিল ১২টি কর্পোরেট সংস্থার হাতে । তাছাড়া মোদী জমানায় প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে । অর্থাত্ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত অনুত্পাদক সম্পদের জন্য মূলত দায়ি হল 'কর্পোরেট সেক্টর'।
তাছাড়া এটা ঠিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানে ভোট ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যত্ নষ্ট করে অনেক সময় কৃষিঋণ মকুব করা হয়ে থাকে । যে কোনও ঋণ মকুবই ব্যাংকের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু কৃষকদের ঋণ মকুবের কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই যে দল যখন করে ফলাও করে প্রচার করে । অথচ তার চেয়ে অনেক অনেক বড় অংকের টাকা শিল্পপতিদের জন্য মকুব করা হলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই চেপে যেতে দেখা যায়।
আবার এটা ঘটনা কৃষকরা ঋণের টাকা না মেটাতে পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা গেলেও সেভাবে কোনও শিল্পপতিকে ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা যায় না। অবশ্য বড় বড় শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট কৃষকদের মতো আত্মহত্যা না করলেও অন্য পথ বেছে নেন। এনারা প্রভাবশালী হওয়ায় গ্রেফতার এড়িয়ে সহজেই দেশ ছেড়ে পালান। সামনেই দুটি জলজ্যান্ত উদাহরণ হল ৯০০০ কোটি টাকা ব্যাংকের পাওনা না মিটিয়ে বিজয় মালিয়া এবং ১১,৪০০ কোটির আর্থিক কেলেঙ্কারির খলনায়ক নীরব মোদী এখন বিদেশে।
বিজয় মালিয়া নীরব মোদীরা এখন কুখ্যাত হলেও কিছুদিন আগেও তো ছিলেন বিখ্যাত । রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনুত্পাদক সম্পদের বোঝা বাড়ানোর জন্য দায়ী অম্বানি,আদানি সহ বেশ কিছু প্রথম সারির শিল্পপতি। কয়েক মাস আগে জানাজানি হয়েছিল ৪৭,০০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা ঘাড়ে অনিল অম্বানি গোষ্ঠীর রিলায়েন্স কমিউনিকেশন। তারপরে ব্যবসা গুটিয়েছে এই শিল্পগোষ্ঠী। এরাও যখন বেকায়দায় পড়লে সুযোগ বুঝে ব্যবসা গোটায় তবে কাদের ভরসায় বণিকসভাগুলি এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ব্যাংক বেসরকারিকরণের কথা বলছে ।
S
সপ্তাহ খানেক আগে জানাজানি হয়েছে গুটিকয়েক গ্রাহককে সুবিধা করে দিতে ১১, ৪০০ কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (পিএনবি) থেকে। আর এই জালিয়াতির ঘটনায় মধ্যমণি হলেন বিলিয়নিয়ার অলংকার ব্যবসায়ী নীবর মোদী, তার মামা মেহুল চোক্সি ও তাদের সংস্থা। এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘিরে দেশ জুড়ে হইচই শুরু হতেই আবার শিল্পমহল থেকে আওয়াজ উঠেছে ব্যাংক বেসরকারিকরণের জন্য।
বণিকসভা ব্যাংক বেসরকারিকরণের মাধ্যমে সমাধান সূত্র খুঁজতে চাওয়ায় একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন এসে যাচ্ছে । তবে কি তাঁরা এদেশের ইতিহাসটা ভুলে গিয়েছে নাকি?
আজকের প্রজন্ম সেভাবে পরিচিত নয় 'ব্যাংক ফেল' কথাটার সঙ্গে । কিন্তু স্বাধীনতার আগে বলে নয় তার পরেও বেশ কয়েক বছর এদেশে মাঝে মধ্যেই ব্যাংকে তালা পড়তে দেখা যেত । সেজন্য একদিকে যেমন কাজ হারাতেন সেই ব্যাংকের কর্মীরা আবার অন্যদিকে সেখানে সঞ্চিত টাকা রেখে সর্বস্ব খুইয়ে পথে বসতেন গ্রাহক এবং আমানতকারীরা। তখনকার বহু গল্প উপন্যাস কিংবা সিনেমায় এই ব্যাংক উঠে যাওয়া ঘটনা উঠে আসত।
শ্রমিক সংগঠনগুলি সম্পর্কে একটা অভিযোগ প্রায়শই ওঠে- ইউনিয়ন শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করছে অথচ তাদের দায়িত্ববোধের দিকটা শেখায়নি। । কারণ শ্রমিকদের উসকে দেওয়া হয়েছে তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলনের দিকে অথচ সংস্থাকে বাঁচাতে কর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া যে উচিত নয়, সে শিক্ষা ইউনিয়ন কখনও দেয়নি। । কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প মহলের আচরণ দেখে উল্টো কথা বলতে হচ্ছে - বণিকসভাগুলি শিল্পপতিদের অধিকার সচেতন করলেও কেন দায়িত্ব সচেতন করছে না।
বিভিন্ন সময় বণিকসভাগুলি তাদের প্রভাবশালীর ক্ষমতা নিয়ে 'লবিবাজি' করে চলেছে - কখনও সেটা সুদের হার কমানোর জন্য কখনও বা কর কমানো অথবা অন্য কোনও সুযোগ সুবিধার দাবিতে। অথচ শিল্প মহলের দায়িত্ববোধ জাগাতে কতটা সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে ? নইলে এভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে অদেয় ঋণের পাহাড় জমবে কেন? ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন শিল্পপতিরা? নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে বেআইনি পথে ঋণ মঞ্জুর অথবা ব্যাংক থেকে অঙ্গীকারপত্র (লেটার অফ গ্যারান্টি) 'ম্যানেজ' করছেন কেন ব্যবসায়ীরা? সমাজে থেকে ব্যবসা করার সময় ঠিক মতো ঋণ পরিশোধ করা যে তাদের দায়িত্ব সেটা কেন মনে রাখা হচ্ছে না? এরা যাতে সুনাগরিকের মতো দায়িত্ব সচেতনভাবে ব্যবসা করে তার জন্য বণিকসভাগুলি কতটা প্রকৃত অর্থে চেষ্টা করেছে ।
দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ৭০শতাংশ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দখলে। নীরব মোদীর এই জালিয়াতি নজরে আসার পরে বণিকসভা ফিকি, অ্যাসোচেম সুপারিশ করেছে সরকারের হাতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ার বেচে ব্যাংক বেসরকারিকরণ জরুরি । যুক্তি দেখান হয়েছে, সরকার গত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বাস্থ্য ফেরাতে চেষ্টা করলেও তা করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে গোটা দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় পুঞ্জীভূত অনুত্পাদক সম্পদের পরিমাণ ৮ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে । তারমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রয়েছে অদেয় ঋণ সাত লক্ষ কোটি টাকা।এরই রেশ টেনে বণিকসভার বক্তব্য এভাবে শুধুমাত্র মূলধন যুগিয়ে কোনও স্থায়ী সমাধান হবে না । বরং ব্যাংক বেসরকারিকরণ হলে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দেওয়ার প্রবণতা কমবে, থাকবে নজরদারি এবং বাড়বে দক্ষতা।
ষাটের দশকের শেষে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে জাতীয়করণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি ব্যাংককেও জাতীয়করণ করা হয়েছিল। ফলে সেভাবে আর এখন ব্যাংক উঠে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না । তাছাড়া তেমন ঘটনা ঘটার আঁচ পেলেই কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাংককে পরিত্রাতার ভূমিকা নিয়ে নড়ে চড়ে উঠতে দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ত্রুটিমুক্ত একথা বলা যায় না ঠিকই। কারণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকার দরুন ব্যাংকের কার্যকলাপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় ঠিকই। তবু রাষ্ট্রায়ত্ত থাকলে সরকারের একটা দায়বদ্ধতা থাকে। কিন্তু ব্যাংককে বেসরকারিকরণের পরে সেই দায়টা সরকার সহজেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
এছাড়া সরকারি সংস্থা মানে অপদার্থ এবং বেসরকারি মানেই তা দক্ষ এমন ভাবনাটাও তো ঠিক নয়। কারণ মনে রাখা উচিত বহু ক্ষেত্রে লোকসানে চলা বেসরকারি সংস্থাকে বাঁচাতেই সাধারণত সরকার তা অধিগ্রহণ করত। বেশি দিন যেতে হবে না কয়েক বছর আগে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। গত শতাব্দীর ৯০ দশকে জন্ম হওয়া বেসরকারি গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাংক যখন লাটে উঠল তখন সেই ব্যাংকে বাঁচাতে অধিগ্রহণ করতে এগিয়ে এসেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অফ কমার্স। ফলে বেসরকারি ব্যাংকের দায়ভার একটি
সরকারি ব্যাংকেরই ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আর একটা কথা মনে করিয়ে দিই, ২০০৭-'০৮ সালে মার্কিন মুলুকে এআইজি এবং লেম্যান ব্রাদার্সের পতনের জেরে শুধু সে দেশ নয় গোটা দুনিয়ার অর্থ ব্যবস্থা কেঁপে উঠেছিল। বহু ব্যাংক ও আর্থিক সংস্থায় লালবাতি জ্বলেছিল। যার জেরে আর্থিক ভাবে ডুবেছিলেন শুধুমাত্র ফাটকাবাজরা নন সাধারণ মানুষও । তবে এটা ঠিক সেই সঙ্কট কালে ভারতের অর্থনীতি তেমন কোনও আঘাত পায়নি কারণ দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাটার মালিকানা মোটের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন। অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মতো এখানকার ব্যাংকগুলি বিদেশি অথবা বেসরকারি মালিকানায় থাকত তাহলে কতটা বিপদে পড়তে হত আশা করি বণিকসভার কর্তারা আজও সেটা অনুভব করতে পারেন।
আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কথা যদি বলা হয় তাহলে দেখা যায় স্বনির্ভর গোষ্ঠী যা ঋণ নেয় তার অধিকাংশই ক্ষেত্রেই সুদ সহ ফেরত পায় ব্যাংক । অর্থাত্ গরিব অথবা সমাজের একেবারে প্রান্তিক মানুষেরা মিলেমিশে ঋণ নিলে সেই টাকা ব্যাংকের মার যায় না বরং সময় মতো তা ফেরত হয়। অন্যদিকে গত বছরে রিজার্ভ ব্যাংক সূত্রে জানা গিয়েছিল অনাদায়ী ঋণের ২৫ শতাংশ ছিল ১২টি কর্পোরেট সংস্থার হাতে । তাছাড়া মোদী জমানায় প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার কর্পোরেট ঋণ মকুব হয়েছে । অর্থাত্ ব্যাংকের পুঞ্জীভূত অনুত্পাদক সম্পদের জন্য মূলত দায়ি হল 'কর্পোরেট সেক্টর'।
তাছাড়া এটা ঠিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানে ভোট ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যত্ নষ্ট করে অনেক সময় কৃষিঋণ মকুব করা হয়ে থাকে । যে কোনও ঋণ মকুবই ব্যাংকের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। কিন্তু কৃষকদের ঋণ মকুবের কথা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই যে দল যখন করে ফলাও করে প্রচার করে । অথচ তার চেয়ে অনেক অনেক বড় অংকের টাকা শিল্পপতিদের জন্য মকুব করা হলে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই চেপে যেতে দেখা যায়।
আবার এটা ঘটনা কৃষকরা ঋণের টাকা না মেটাতে পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা গেলেও সেভাবে কোনও শিল্পপতিকে ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মহত্যা করতে দেখা যায় না। অবশ্য বড় বড় শিল্পপতি ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট কৃষকদের মতো আত্মহত্যা না করলেও অন্য পথ বেছে নেন। এনারা প্রভাবশালী হওয়ায় গ্রেফতার এড়িয়ে সহজেই দেশ ছেড়ে পালান। সামনেই দুটি জলজ্যান্ত উদাহরণ হল ৯০০০ কোটি টাকা ব্যাংকের পাওনা না মিটিয়ে বিজয় মালিয়া এবং ১১,৪০০ কোটির আর্থিক কেলেঙ্কারির খলনায়ক নীরব মোদী এখন বিদেশে।
বিজয় মালিয়া নীরব মোদীরা এখন কুখ্যাত হলেও কিছুদিন আগেও তো ছিলেন বিখ্যাত । রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনুত্পাদক সম্পদের বোঝা বাড়ানোর জন্য দায়ী অম্বানি,আদানি সহ বেশ কিছু প্রথম সারির শিল্পপতি। কয়েক মাস আগে জানাজানি হয়েছিল ৪৭,০০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা ঘাড়ে অনিল অম্বানি গোষ্ঠীর রিলায়েন্স কমিউনিকেশন। তারপরে ব্যবসা গুটিয়েছে এই শিল্পগোষ্ঠী। এরাও যখন বেকায়দায় পড়লে সুযোগ বুঝে ব্যবসা গোটায় তবে কাদের ভরসায় বণিকসভাগুলি এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ব্যাংক বেসরকারিকরণের কথা বলছে ।
S

Comments
Post a Comment